বৃহস্পতিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১২

অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর চিঠি

কলকাতা                                                                 ৩১ আক্টোবর ১৯৬৪
প্রিয় মিস্টার গিন্সবার্গ
আমি আপনার ১৩ তারিখের অকারণে অসৌজন্যবিশিষ্ট চিঠিটি পেয়ে বিস্ময়াভিভূত । আপনি যে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে সাম্যবাদীদের বক্তব্যানুযায়ী জোচ্চোর ও ষাঁড়ের-গোবর বদান্য-বুদ্ধিবাদী কম্যুনিস্টবিরোধী সঙ্ঘ বলে মনে করেন, তা বলাবাহুল্য, আমাকে অবাক করেনি ; কেননা আমি কখনও কংগ্রেসকে 'বুর্জোয়া' ও 'সন্মানীয়' হিসাবে হেয় করার আপনার অভিযোগ অস্বীকার করব না ।
কোনও সুপরিচিত সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে তাদের সাহিত্যিক কর্মের জন্য যদি পুলিশ নির্যাতন করে  তাহলে আমি নিশ্চিত যে ইনদিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম আপনার অসন্মানজনক প্ররোচনা ব্যতিরেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে । আমি আপনাকে জানাতে আনন্দ বোধ করছি যে সাম্প্রতিককালে তেমন কোনও ঘটনা ঘটেনি । মলয় রায়চৌধুরী ও তার হাংরি জেনারেশনের সদস্যরা, আমার জ্ঞানানুযায়ী, কোনও বিশেষ সাহিত্যিক অবদান রাখেননি, যদিও তাঁরা বহু আত্মবিজ্ঞাপনমূলক  লিফলেট লিখেছেন ও বিতরন করেছেন ; এবং নোংরা ও অশালীন ভাষায় সন্মানীয় নাগরিকদের গালমন্দ করেছেন ( আশা করি "গাঙশালিক কাব্যশৈলীর জারজদের ধর্ষণ করো" বাক্যটিতে 'ধর্ষণ' শব্দটি অশ্লীল ও 'জারজ' শব্দটি নোংরা হিসাবে আপনিও মেনে নেবেন; ওরা এর চেয়েও খারাপ ভাষা বহু কবির ক্ষেত্রে নামোল্লেখ করে প্রবোগ করেছে ) । সম্প্রতি ওরা এক মহিলাকে ভাড়া করে জনসমক্ষে তার উন্মুক্ত বুক প্রদর্শনের ব্যবস্হা করেছিল এবং সেই চমৎকার আভাঁ গার্দ প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করার জন্য অনেকের সঙ্গে আমাকেও নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল ! কলকাতায় অমন বালখিল্য রঙ্গকৌতুককে বিশ্বের অপর পার থেকে উৎসাহ দেয়াকে আপনি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতি কর্তব্য বলে মনে করতে পারেন । আমার কর্তব্য সম্পর্কে আপনার সঙ্গে মতবিরোধের অনুমোদন আপনি করবেন আশা করি ।
এই যুবকদের পাতা ফাঁদে পড়া এবং কয়েকজনকে কয়েকদিনের জন্য হেফাজতে নেয়া পুলিশের পক্ষে নিঃসন্দেহে বোকামি হয়েছে ( তাদের সবাইকে এখন ছেড়ে দেয়া হয়েছে ), এবং তার মাধ্যমে এদের প্রচার ও জনগণের সহানুভূতির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে--- রঙ্গকৌতুকের মাধ্যমে তারা প্রধানত প্রচার পেতেই চাইছিল ।
আমি মনে করি না যে আমেরিকান বিটনিক কবিতার এই সমস্ত অপরিণত অনুকরণকারীদের সমর্থন করা ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের প্রধান কাজ । ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমার ভাষার সাহিত্যিকদের সম্পর্কে আপনার মতামতের দ্বারা আমি নিজেকে চালিত করার অনুমতি দেব না--- যে ভাষা সম্পর্কে আপনি নিজেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ রাখার অবস্হানটি বেছে নিয়েছেন ।
আমাদের পরস্পরের গভীর মতবিরোধ সত্ত্বেও, এবং আপনার কয়েকটি অপূর্ব কবিতার প্রতি মুগ্ধতাবোধসহ শুভেচ্ছা জানাই ।
ভবদীয়
আবু সয়ীদ আইয়ুব 
( সমীর রায়চৌধুরী ও কয়েকজন হাংরি আন্দোলনকারী পরবর্তীকালে আইয়ুব সাএবের সঙ্গে দেখা করলে তিনি স্বীকার করেন যে চিঠিতে ব্যবহৃত তথ্যের জন্য তিনি অন্যের উপর নির্ভর করেছিলেন; তিনি স্বয়ং তথ্যগুলি যাচাই করার প্রয়াস করেননি । )
     

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

অনিল করঞ্জাই ( সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা )

বেনারস
১০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩

কী সমীর ?
      খুব তো 'খেউড়' দুর্গাপুজোর আগে... লেখা না পাঠালে কিছুই ভাবা সম্ভব নয়... কবিতার বইও ফেঁসে রইলো ভাষাতেই...আমি দিন-রাত লেগে আছি...নানান কাজে । পয়সাকোড়ি কিছুই থাকে না... কী কোরি ? মলয়কে বোলো ভ্যান গঘ লেখাটা অনুবাদ কোরে পাঠাতে । 'আমুখ'-এ ছাপবে কাঞ্চন। আমার অ্যাব্সট্র্যাক্ট পেইনটিং-এর বইটা প্লাস আর্তোর অ্যানথোলজি বাই পোস্ট পাঠাও । দরকার আছে। নভেম্বরে দিল্লি এগজিবিশান ঠিক-ঠাক । তোমরাও যাবে । ছোবি হোক। 'খেউড়' ব্যাপারটা ভেবেছো তো ? ঠিক কোরে পাঠাও।
                                                     অনিল  

কাঞ্চন মুখোপাধ্যায় ( সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা )

বেনারস
২০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩
সমীর,
     এখান থেকে গিয়ে আর কোনো চিঠিই দিলে না। 'আমুখ-৫' তোমায় পাঠিয়েছি। পেয়েছ নিশ্চই। কলকাতায় পোস্টার লাগানোর কী হল ? কলকাতার ব্যাপারটা না হলে আমি দিল্লি যাচ্ছি । তুমি যাবে ?
ইতি
কাঞ্চন

করুণানিধান মুখোপাধ্যায় ( সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা )

বেনারস
তারিখ মনে পড়ছে না
প্রিয় সমীর
      'খেউড়' পত্রিকার হাফপেজ স্কেচ সুবীরের করা প্রেসে ছাপতে চোলে গ্যাছে। সমীর, এর পর আমার, অনিলের, বিভাসের এক সঙ্গে যাবে আর সঙ্গে হাফ পেজ পোস্টার। পোস্টারটা এ্যামোন করা হোচ্ছে যা কভার ও পোস্টার দুটোতেই লাগবে-- এ্যাকটা দারুন আইডিয়ায় এই নতিজায় পোঁছোনো গ্যালো ল রোনজুর, তোমার আর কারুর লেখা পাঠাও 'খেউড়' এর জোন্নে-- যোদি কোনো আরও খবর থাকে তো পাঠাও 'খেউড়' এর জোন্নে। অনিল উঠে পোড়ে লেগেছে এ্যাখোন।
     মলয় ৫০ টাকা পাঠিয়েছে। ওই থেকে হাফপেজ লিথোতে ছাপতে দেয়া হোয়েছে । কাল ডেলিভারি পাবি। বাকি 'খেউড়' এর কি বাজেট হোতে পারে বা হবে তুমি জানাও। আমরা এ্যাকটা মোটামুটি বাজেট পরের চিঠিতে জানাচ্ছি ।
     মলয় লিখেছে আমায় তিন মাসের প্ল্যান দিয়ে। পোস্টার সম্বন্ধে আমি ওকে জানিয়ে দিলাম । সব তোমার হাওয়ালে । তুমি ওর সঙ্গে ইমিডিয়েট পত্রালাপ কোরে নাও --- তা না হোলে ওকে জানো তো ও আকাশেই পোস্টার দেখছে-- উড়ে আসছে...উড়ে আসছে...। চিঠিতে লিখেছে কি সব রাস্তার নুড়ির মত ঘুরে বেড়াচ্ছি । বোধ হয় প্রেমিকাদের কোনো হিং লেগেছে... সেই পোঁদে নিয়ে ঘুরছে ।
     আমার ধর্মগ্রন্হ 'সানপাকু' শেষ কোরলাম কাল রাত্রে । এখোন শুধু ফিরাক কোথায় আমার জোন্নে রাখা আছে ৪০০ টাকা---
      আরো যা হয় লিখো
                                                                করুণা 

                              

সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

ত্রিদিব মিত্র-র চিঠি ( মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা )

 উন্মার্গ
সালকিয়া
হাওড়া
১৭/৭
ডিয়ার মলয়,
        পোস্টকার্ড পেয়েছ সম্ভবত। শুক্রবার পাঞ্জাব মেলে চাপছি। সুবিমলের সঙ্গে গতকাল হঠাৎ হাওড়া স্টেশানে দেখা, সন্ধেবেলা। ট্রেন ধরতে না পারায় সোমবার রাত্তিরে সিদ্ধি চলেছিল।
        সুভাষ ইদানিং নতুন সাকরেদ জোগাড় করেছে, কফিহাউস থেকে বা কফিহাউসে এনে। গদ্য ও কবিতার ওপর, হাংরিদের, অমিতাভ দাশগুপ্ত ও মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের দুটো প্রবন্ধ ক্ষু.প্র.তে থাকছে। সে-ব্যাপারে উভয় ঘোষবাবু ও দাশগুপ্তবাবু, দাশগুপ্ত ও চাটুজ্জেবাবুর বাড়িতে ঘনঘন যাতায়াত, পাঞ্চিং, লিঞ্চিং ইত্যাদি ব্যাপারে বড়োই ব্যস্ত। সুভাষ প্রচার করত, ১৯৬০ সালে তুমি নাকি সুবোকে তুলে এনেছ।  AVANT GARDE   আদ্যপান্ত পড়েও খুঁজে পেলাম না। তাছাড়া হাংরি বুলেটিন প্রথম বেরোয় ১৯৬১-এর শেষে আর সুবোর লেখা গোলমাল হাংরি বুলেটিনে ১৯৬৩ তে, তখন আমার বাসায় থাকত।
        সুভাষ ক্ষু.প্র.র জন্যে ১ পৃষ্ঠার লেখা চেয়েছিল। এবং আমিও 'উন্মাগ'-র জন্যে সুভাষের। কিন্তু সুভাষবাবু এত ব্যস্ত কিংবা...
                                                       ত্রিদিব 
              

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১২

প্রদীপ চৌধুরীর চিঠি ( মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা )

প্রিয় মলয়,
        এর মধ্যে তোমাকে চিঠি, সুভাষকে চিঠি এবং টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি, তোমার ঠিকানা সম্পর্কে আমি শিওর নই, তাই আর কিছু করতে পারলাম না। ট্রাংক কল করার ইচ্ছে ছিল।
        কলকাতার পুলিশ আমাকে ৩১ মার্চ, ৬৫ ত্রিপুরায় এসে গ্রেপ্তার করেছে ; কিন্তু আজ আর সেই প্রাথমিক উচ্ছাস একদম নেই, জুজুর ভয়ও নেই। কবিতার বুকের ওপর চেপে বসলে সম্ভবত এইটেই ভবিতব্য। তুমি হাজতে বসে যা আমাকে লিখেছিলে ---- আমি তার সিগনিফিকান্স আগে যেমন, এখন তার চেয়ে অনেক স্বাভাবিক, তাই অনেক ভয়ংকর করে ভাবতে পারছি।
        অনেকদিন এমন নিঃসঙ্গতা ও ভয় ও অনুশোচনায় কাটিয়েছি যে, কী দারুণ উৎকন্ঠার ভিতর আমি প্রদীপ চৌধুরীর যাবতীয় আবরণ খুলে, লাথি মেরে নষ্ট করে, একজন কবন্ধ লেখকে পরিণত হয়েছি। আমাকে না দেখলে আমার মুখোমুখি না হলে, তুমি বুঝতে পারবে না। অসম্ভব দুঃখ পেয়েছি যেদিন শৈলেশ্বরদের ঠিকানা থেকে আমার বই ফেরত এসেছিল ( ওরা রিফিউজ করেছিল ) --- হ্যাঁ তখন থেকে আমার অসহায় দুঃখকে চাবুকের মতই আমি নিজের শরীরে ব্যবহার করে আসছি।
        এনি হাউ, আমি ১২ এপ্রিল দুপুর ১২-১২.৫০ এর মধ্যে দমদম বিমানঘাঁটিতে পৌঁছব। কলকাতা পৌঁছে ব্যক্তিগতভাবে আমার একমাত্র সান্ত্বনা থাকবে বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেই যদি তোমাকে এবং অন্যান্য সবাইকে দেখতে পাই। যেভাবেই হোক বিমানঘাঁটিতে চলে এসো। তারপর এয়ারলাইন অফিস এর গাড়িতে না এসে একসঙ্গে ট্যাক্সিতে করে ফেরা যাবে কলকাতায়।
        ১৪ এপ্রিল কোর্টে সারেন্ডার করার দিন। এর মধ্যে জামিনের সব ব্যবস্হা করে রেখো। আজ আর কিছু লিখি না --- লিখলে কেবল অনুশোচনা ও বর্বর সহানুভূতিই আমাকে কাটবে। ভালোবাসা জানাই। তোমার
                                                                     প্রদীপ চৌধুরী
                                                                        ৭/৪/১৯৬৫ 
                      

রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১২

সুবিমল বসাক-এর চিঠি ( সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা )

১৩ বিপিন গাঙ্গুলি রোড
দমদম, কলকাতা ৭০০ ০৩০
২৭/৭/১৯৬৪
প্রিয় সমীরদা
        আমি পাটনায় গিয়েছিলুম, শুনলুম আপনি চাইবাসায়। মলয়কে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা বলেছি। শক্তি একদিন ( যেদিন যুগান্তরে নিউজ বেরিয়েছিল ) আমায় কফিহাউস থেকে নীচে ডেকে মারধোর করার চেষ্টা করেছিলো। আপনি জানেন, আমি পাটনার ছেলে, মুখে কথা বলার চেয়ে কাজে বেশী--- সেদিনই আমি শক্তিকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দিতুম, কিন্তু আমার বন্ধুদের জন্য করলাম না। তবে আমি ডায়েরি করেছি থানায়, এই বলে রটিয়েছি, এবং ভবিষ্যতে শক্তির নামে কেস ঠুকে দেবো বলেছি। 'হাংরি জেনারেশান' বুলেটিনটা এখনও বের হল না। প্রেসগুলি ছেপে দেবে বলে কথা দিচ্ছে অথচ ম্যাটার দেখে সরে যাচ্ছে। এখানে অবশ্য নানা রকম রিউমার শোনা যাচ্ছে। অনেক কথা। আজ স্টেনসিলে একটা 'হাংরি বুলেটিন' বের করে দিলাম-- ডিসট্রিবিউট করিনি। ওটা পাটনা থেকে ছেপেছি, বলেছি। কলকাতা কবে আসছেন ? মলয় সম্ভবত অগাস্টে আসবে বলে কথা দিয়েছে। দেখা যাক। এখন এলে পরে সবার সঙ্গে দেখা করার চান্স আছে। মলয়কে 'হাংরি' বুলেটিন পাঠিয়েছি।
                                                                          সুবিমল বসাক
( শক্তি চট্টোপাধ্যায় হাংরি জেনারেশান মামলায় মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। যে বুলেটিনটির কথা সুবিমল বসাক চিঠিতে লিখেছেন সেইটির বিরুদ্ধে ব্যাংকশাল কোর্টে মামলা হয়েছিল। শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ, যাঁদের লেখা এই সংখ্যাটিতে ছিল, তাঁরা মলয়ের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিলেন।